Building Healthy Bangladesh

নিম তেল কথন

নিম তেল কথন
December 19, 2018 Brishty Parvin
In Healthy Living

নিম গাছ বাংলাদশের একটি অতি পরিচিত উদ্ভিদ! চিরসবুজ এই গাছটির বোটানিক্যাল নাম Azadirachta indica

গুণে ভরপুর  এই গাছটির পাতা, ফল, বাকলসহ প্রায় সবকিছুই  প্রাচীনকাল থেকে  বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে! ধারণা করা হয় আয়ুর্বেদিক ঔষুধী হিসেবে নিম ভারত অথবা বার্মাতেই প্রথম আবিষ্কৃত হয়! নিমের পাতা ও বীজকে পিষে নিমতেল তৈরি হয় অথবা নিমের বীজ থেকে নির্যাস বের করে বানানো হয় নিমের তেল।

নিমের তেলের রঙ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে! এটি সাধারনত সোনালি হলুদ, হলদে বাদামী, লালচে বাদামী, গাঢ় বাদামী, সবুজাভ বাদামী, উজ্জ্বল লাল হয়ে থাকে ! এটির রয়েছে কড়া গন্ধ যা বাদাম আর রসুনের মিশ্র গন্ধের মতো হয়ে থাকে কিছুটা !

নিমের তেলে রয়েছেঃ

  • ফ্যাটি এসিড
  • ভিটামিন ই
  • ট্রাইগ্লিসারাইড
  • এন্টি অক্সিডেন্ট
  • ক্যালসিয়াম ইত্যাদি

 

চুলের যত্নে নিম তেলঃ  

 

১। স্কাল্পের সংক্রমন জাতীয় সমস্যা ও খুশকি দূর করে

ফাঙ্গাল ইনফেকশন হলে সাধারণত ত্বকে খুশকির সমস্য়া হয়ে থাকে। মাথার চুলে ও ত্বকে নিয়মিত নিম তেল ব্যবহারে খুশকি থেকে দূরে থাকা সম্ভব। এছাড়া মাথার স্কাল্পের যেকোনো ধরনের সংক্রমণ/ চুলকুনির সমস্যা কমাতেও নিম তেলের জুরি মেলা ভার। চুলে শ্যাম্পু করার সময় তাতে কয়েক ড্রপ নিম তেল মিশিয়ে নিয়ে মাথায় মেখে ২-৩ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলতে হবে , তাহলেই সমস্য়া কমতে শুরু করবে । এভাবে ব্যবহারে উসকোখুসকো ও প্রাণহীন চুলও তার উজ্জ্বল্য ফিরে পেতে পারে।

২। উকুন প্রতিহত করে

নিয়মিত নিম তেল ব্যবহারে উকুন তাড়ানো সম্ভব। যাদের মাথার তালুতে ব্রণের সমস্যা আছে তারাও এই তেল মাথায় দিতে পারে।

৩। চুল পড়া , চুল ভাঙা রোধ করে

প্রতিদিন কিছুটা পরিমাণ নিমের তেল নিয়ে মাথার ত্বক ও চুলে হালকা করে ঘষে ঘষে লাগিয়ে কিছুক্ষণের জন্য রেখে দিতে হবে এবং এরপর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। এতে চুল পড়া,চুল  ভাঙা বন্ধ হবে এবং  চুলের গোড়াও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

ত্বকের যত্নে নিম তেল

১। ত্বকের দাগ দূর করেঃ

নিম তেল ফ্যাটি এসিডে সমৃদ্ধ যার ফলে এটি সহজে ত্বকের সাথে মিশে যায় এবং সংকোচন-প্রসারণ সহজতর হয়! নিয়মিত নিম তেল ব্যবহার করে ত্বকের বলিরেখা ও বার্ধক্যজনিত যাবতীয় দাগ দূর করা সম্ভব। এটি ত্বককে নমনীয় করে তোলে,  ত্বকের  লাল দাগসমূহ দূর করে, ব্রণের ক্ষত সারিয়ে তোলে। ছোট খাটো কাটা বা ক্ষত সারাতেও নিম তেলের জুড়ি নেই।

২। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখে :

নিমের ভিটামিন ই ও ফ্যাটি এসিড ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে গভীরভাবে কাজ করে। যাদের ত্বক শুষ্ক তারা নিয়মিত এই তেল লাগালে সমস্য়া অনেকটাই কমে যায়। প্রতিদিন নারকেল তেল বা অলিভ অয়েলের সঙ্গে নিম তেল মিশিয়ে ভালো করে সারা শরীরে মালিশ করলেই দেখা যাবে ত্বক সুন্দর হয়ে উঠছে ।

৩। ব্রণের প্রকোপ কমায়ঃ
নিম তেলের  অ্যাসপিরিন জাতীয় উপাদান ব্রণ হওয়ার জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে ধ্বংস করে। নিম তেলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট  থাকায় এটি ব্রণের সমস্য়া কমাতে কাজ করে। ব্রণ কমাতে কয়েক ফোঁটা নিম তেলের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা ল্য়াভেন্ডর তেল মিশিয়ে ব্রণর উপর লাগাতে হবে।

৪। ত্বকে তারুণ্য ধরে রাখেঃ

নিমের তেলে আছে এন্টি অক্সিডেন্ট যা ত্বকের জন্য খুবই উপকারি। এটি ত্বকে বার্ধক্যের ছাপ সহজে পড়তে দেয় না। সময়ের সাথে সাথে কেউ যদি ত্বকের বয়স বাড়াতে না চায়, তাহলে নিয়মিত নিম তেল দিয়ে ত্বকের মাসাজ করতে হবে ! ফেসপ্যাকের সঙ্গে নিমের তেল মিশিয়েও লাগানো যায়!  এভাবে ব্যবহারে ত্বক সজীব হয়ে উঠে, বলিরেখা কমে, সাথে সাথে স্কিন টানটান হয়। ফলে ত্বকের বয়স কম লাগে।
৫। অ্যাকজিমা প্রতিরোধ করেঃ

নিম তেল ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রেখে অ্যাকজিমা প্রতিকার ও প্রতিরোধ করে। শরীরের যে জায়গায় একজিমা হয়েছে, সেখানে নিম তেল লাগালে যন্ত্রণা কমে।

*বংশগত কারণে কারও অ্যাকজিমা হলে নিমের তেল তা পুরোপুরি সারিয়ে তুলতে সক্ষম নাও হতে পারে।

**ভুলেও  সরাসরি ত্বকের উপর নিম তেল ব্য়বহার করা যাবে না। সামান্য় গরম পানিতে  কয়েক ড্রপ নিম তেল মিশিয়ে তা দিয়ে রোজ গোছল করলে রোগ কমতে শুরু করবে ।

৬। ত্বক ফর্সা করতে ও হাইপারপিগমেন্টেশন দূর করতে সাহায্য করেঃ

নিমের তেলের ব্যবহার ত্বকে অতিরিক্ত মেলানিন তৈরিতে বাধা দেয়, আর মেলানিন কম থাকা মানে ত্বকে ফর্সাভাব বৃদ্ধি পাওয়া ! নিমের ফ্যাটি এসিড ত্বকে কোলাজেনের উৎপাদন বাড়ায় যার প্রভাবে স্কিন টোনের দ্রুত উন্নতি ঘটে ।
ত্বকে মেলানিনের পরিমান বাড়লেই লক্ষণ বাড়ে হাইপারপিগমেন্টেশনের! নিয়মিত যদি সারা শরীরে নারকেল তেলের সঙ্গে নিম তেল মিশিয়ে লাগানো যায় তাহলে মেলানিনের মাত্রা কমে। আর মেলানিন কমলে স্বাভাবিক ভাবেই কমতে শরু করে হাইপারপিগমেন্টটেশনও।

৭। কালচে আচিল দূর করেঃ
২-৩ ফোঁটা নিমের তেল পানিতে মিশিয়ে কালো আঁচিলে নিয়মিতভাবে লাগালে তা চিরতরে দূর হয়ে যায় !

৮। ত্বকের উন্মুক্ত ছিদ্র বন্ধ করেঃ

নিমের এন্টিব্যকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি প্রপার্টিজ উন্মুক্ত ছিদ্র বন্ধ করতে দারুন কাজে আসে। নারকেল তেলের সঙ্গে নিম তেল মিশিয়ে মুখে লাগালেই  সমস্য়া কমতে শুরু করবে ।

৯।ত্বকের  সংক্রমণের চিকিৎসায় কাজে আসে :

অস্বাস্থ্যকর অবস্থার জন্য পায়ে অ্যাথলিট’স ফুটের মত ছত্রাকজনিত সমস্যা হতে পারে । আর এই রোগ হলে পায়ে যন্ত্রণা হয়ে থাকে। ত্বকের এই সমস্য়ার প্রকোপ কমাতে নিম তেলের সঙ্গে নারকেল তেল মিলিয়ে সংক্রমণের জায়গায় লাগাতে হবে । এমনটা রোজ করলে, অল্প দিনেই রোগ কমতে শুরু করে ।

পোকামাকড় ও মশার উপদ্রব থেকে বাচতে ও ঘরকে জীবানুমুক্ত রাখতে নিমের তেল-

বাড়িতে পিঁপড়া, তেলাপোকা এবং অন্যান্য পোকামাকড়ের হাত থেকে রেহাই পেতে নিম তেল বহুল ব্যবহৃত হয়! বাড়িতে মশার  উপদ্রব থেকে বাঁচতে পানির সাথে নিমের তেল মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে। এছাড়া ১০-১৫ ফোটা নিম তেল আধা কাপ নারকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে গায়ে লাগালেও  মশারা আর ধারে কাছে ঘেঁষবে না।
ঘরের মেঝে জীবাণুমুক্ত রাখতে সাবান পানিতে নিম তেল মিশিয়ে মুছে নিলেই হবে!

 

ওষুধ ও জন্মনিরোধক  হিসেবে নিমের তেল-

নিম তেল একটি উৎকৃষ্ট মানের এন্টিসেপটিক!  ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ও উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসার জন্য যেসব ঔষধ গ্রহণ করা হয় সেগুলোতে নিমের তেল থাকে।

নিম তেল একটি উত্তম প্রাকৃতিক জন্ম নিরোধকও । নিম তেল একটি শক্তিশালী শুক্রাণুনাশক হিসেবে কাজ করে। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, নিম তেল মহিলাদের জন্য নতুন ধরনের কার্যকরী গর্ভনিরোধক হতে পারে। এটি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই শুক্রানু মেরে ফেলতে সক্ষম।

দাতের যত্নে নিমের তেল

নিম তেল ক্যাভিটি সৃষ্টিকারী জীবাণু ধ্বংস করে! পেস্টে নিমের তেল ব্যবহার এখন অনেক দেশে সমাদৃত এবং বিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত! নিয়মিত ব্যবহারে দাত ও মাড়ি মজবুত হয়!

সীমাবদ্ধতা

নিমের তেল বা অন্যান্য নিমের পণ্য যেমন নিমের পাতা বা নিমের চা গর্ভবতী অথবা গর্ভধারণে আগ্রহী মহিলা এবং শিশুদের খাওয়া উচিৎ নয়!

নিমের তেলের অতিরিক্ত সেবন লিভার নষ্টে সাহায্য করতে পারে বলে কিছু লক্ষণ পাওয়া গেছে!

*ত্বকে নিম তেল ব্যবহারের পূর্বে এক ফোটা তেল হাতের তালুর  উপরিভাগে লাগিয়ে পরীক্ষা করে নেয়া ভালো! ২৪ ঘন্টার মধ্যে যদি কোনো এলার্জি (যেমন লাল হয়ে যাওয়া বা ফোলাভাব) এর লক্ষণ না দেখা যায় তবে নিশ্চিন্তে এটা শরীরের যে কোনো জায়গায় ব্যবহার করা যেতে পারে!

**যে কোনো সময়ে ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দিলে বা শ্বাস-প্রশ্বাসের  সমস্যা হলে তৎক্ষণাত এর ব্যবহার বন্ধ করা উচিৎ।

 

সংরক্ষণঃ  

ঠান্ডা ও অন্ধকার জায়গায় সংরক্ষণ করা উচিৎ!

প্রাপ্তিস্থানঃ

parmeeda.com

Comments (0)

Leave a reply