বিন্নি চালের ইতিকথা

বিন্নি চালের ইতিকথা
April 26, 2022 Parmeeda
In Food, Life style, Organic

বিন্নি চালের ইতিকথা

ভাত বাঙালিদের প্রধান খাবার। ভাত ছাড়া আমাদের চলেই না। তবে ভাতের পুষ্টিগুনই সর্বোত্তম নয়। একারনে অনেককেই ডাক্তারের পরামর্শে ভাত খাওয়া কমিয়ে দিতে হয় কিংবা বাদই দিতে হয়।

আমরা সাধারণত যে কয়েকটি জাতের চাল খেয়ে থাকি বা যাদের সাথে পরিচিত, সেগুলো ছাড়াও কিন্তু চালের আরও বাহারি গুণাগুণ ও স্বাদসম্পন্ন জাত আছে। পৃথিবীতে প্রায় ১,২০,০০০ ধরনের ধান বা চাল পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু কিছু তাদের বৈশিষ্টের কারণে আলাদা। তেমনই একটি বিশেষ প্রকারের চাল হল বিন্নি চাল।

বিন্নি চাল সাধারণত সাদা, লাল এবং কালোও হয়ে থাকে। বিন্নি উৎপাদিত হয় মূলত পাহাড়ি এলাকাতে। বাংলাদেশের সিলেট, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি অঞ্চলে জুম চাষের মাধ্যমে স্থানীয় উপজাতিরা বা কৃষকেরা এই ধান উৎপাদন করে থাকেন। সিলেটে এই চালকে বিরুন চালও বলা হয়ে থাকে। নবান্ন উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ বিন্নি চালের পিঠা, পায়েস, ফিরনি ইত্যাদি।

বিন্নি চালের বিশেষত্ব হল এতে অন্য সব চালের তুলনায় ক্যালোরি ও কার্বোহাইড্রেট কম। এই চালের অন্য সব চালের তুলনায় গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশ কম। তাই ডায়াবেটিস বেড়ে যাবার বা মুটিয়ে যাবার ভয় কম থাকে।

এছাড়াও বিন্নি চাল অন্য অনেক খাদ্য গুনে ভরপুর। রোগ প্রতিরোধে সেরা বিন্নি চাল ক্যানসাররোধী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যেমন অ্যানথোসায়ানিন বা ফ্ল্যাভেনয়েডে পরিপূর্ণ। মূলত এই ক্যান্সার প্রতিরোধক অনেক বেশি পরিমাণে ধারণ করার কারণেই এর রংটা অন্য চালের তুলনায় গাঢ় হয়ে থাকে।

এই চালে শর্করা কম, কিন্তু আঁশ ও ভিটামিন-বি এর পরিমাণ অনেক বেশি। এছাড়াও বিন্নি চাল ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, সেলেনিয়াম ইত্যাদি বিভিন্ন খনিজ লবণে ভরপুর। ফলে এই চাল নিয়মিত খেলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ধমনিতে রক্ত জমাট বাঁধা কিংবা হজমে গোলমাল সহজেই নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়াও ত্বক, চুল ও হাড় মজবুত করতে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এই চালের জুড়ি নেই।

অন্য ধানের মত বিন্নি ধানকে সেদ্ধ করে নিতে হয়না বলে এক্ষেত্রেও পুষ্টিগুণ থাকে অটুট। তাছাড়া জুম পদ্ধতিতে চাষ করা হয় বলে পাহাড়ি উর্বর মাটির অনেকটা পুষ্টিগুণ এই চালে রয়ে যায়।

কালো বিন্নি চাল-

চীনে চতুর্দশ শতক থেকে সপ্তদশ শতকে মিং যুগে কালো বিন্নি চাল চালের চাষ হতো। কিন্তু রাজা বা রাজ পরিবার ছাড়া কারো কালো চালের ভাত খাওয়ার অধিকার ছিল না। প্রজাদের জন্য এই চাল নিষিদ্ধ ছিল বলে এই চালকে বলা হয় ‘নিষিদ্ধ চাল’ বা ‘ফরবিডেন রাইস’। থাইল্যান্ডে এই চালকে বলা হয় ‘কাও নাইও ডাহম’। ইংরেজিতে একে মানুষ বিভিন্ন নামে চেনে। যেমন;  ‘Black Sweet Rice’, ‘Black Glutinous Rice’ ও ‘Indonesian Rice’। পার্বত্য এলাকায় এই চালকে বলা হয় পোড়া বিন্নি চাল। পরবর্তীতে জাপান ও মায়ানমারে এই চালের চাষ শুরু হয়। সেখান থেকে এই চাল চলে আসে বাংলাদেশে। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রামে এটি চাষ হতো বলে জানা যায়। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকার পাহাড়ে জুমে এই চাষ অব্যাহত আছে।

বিন্নি চালের বিভিন্ন জাত-

পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে এই চাল বিলাসী খাদ্য বা দামি চাল হিসেবে পরিচিত। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তংচংগা সম্প্রদায়ের লোকজন এই চাল বেশি খায়। তাদের কাছে এই চাল ‘পোড়া বিন্নি’ নামেও পরিচিত।  পাহাড়ি এলাকার স্থানীয় জাতের মধ্যে বিন্নি আদি ধান।বর্তমানে বিন্নি চালের রঙ অনুসারে কালো, লাল ও সাদা তিন ধরনই পরিচিত। এরপরেও রয়েছে চন্দন, গেং গেং, মৌ, দুধ, রাঙা, আসানিয়া, ছৎ ছৎ, বিজাবিরাং, কুৎচিয়া, আগুনিয়া, কাককুয়া, চিচাও, লেদার, লোবা, কবা, কাশিয়া, হরিন, লক্ষী, দরিমা, গারো বিন্নি ইত্যাদি।

বিন্নি চাল দিয়ে কী করা হয়-

বিভিন্ন উৎসবে বিন্নি চালের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সমতল এবং পাহাড়ি দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এই চাল দিয়ে বিভিন্ন খাবার তৈরির ঐতিহ্য রয়েছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিন্নি চাল পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিন্নি চালের গুড়া দিয়ে পায়েস, ভাপা পিঠা, মুখশালা, চিতই, ভেজানো পিঠা, পাটিসাপটা, চোক্ষা পিঠা, কলা পিঠা, ক্ষীর ইত্যাদি তৈরি করা যায়। এই চালের পিঠা অন্যান্য চালের পিঠার চেয়ে নরম হয়।

কীভাবে রান্না করতে হয়-

বিন্নি চালের ভাত রান্না করার রয়েছে বিশেষ পদ্ধতি। রান্না করার জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ঘন্টা এই চাল ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর পানি ঝরিয়ে নিয়ে অল্প পানি দিয়ে রাইস কুকারে পরিমাণমতো লবন এবং কুড়ানো নারিকেল ছড়িয়ে দিয়ে রান্না হবে বিন্নি ভাত। অথবা পানিতে নারিকেল আর লবন দিয়ে ফুটাতে হবে। পানি ফুটতে থাকলে চাল দিয়ে দিলে স্বাভাবিকভাবে আমরা যেভাবে ভাত রান্না করি সেভাবেই হয়ে যায়।এছাড়াও ভাপে দিয়েও ভাত রান্না করা যায় যাকে আমরা বলি স্টিমড রাইস। খেজুরের রস, দুধ চিনি দিয়ে বা মুরগীর মাংস দিয়ে বিন্নি ভাত খেতে বেশ সুস্বাদু।

 

Comments (0)

Leave a reply

Your email address will not be published.

*